

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার জালিয়াপালং ইউনিয়নের চেনছড়ি এলাকায় বৌদ্ধ মন্দিরে হামলা, বুদ্ধমূর্তি ভাঙচুর এবং সংখ্যালঘু পরিবারের ওপর হামলার অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কয়েকটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, ঘটনাটির মূল কারণ বন বিভাগের সংরক্ষিত জমি নিয়ে বিরোধ। এখন পর্যন্ত সংঘবদ্ধভাবে ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলার প্রমাণ মেলেনি।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ৩১ জুলাই বিকেলে বন বিভাগের সংরক্ষিত জমিতে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে দখলের চেষ্টা হলে বন বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান। এ সময় সাবেক ইউপি সদস্য মো. বেলাল, মংফু চাকমা ও নুরুল হক পক্ষের লোকজনের মধ্যে বাকবিতণ্ডা ও ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। বন বিভাগ জানিয়েছে, মংফু চাকমার বিরুদ্ধে বন আইনে একাধিক মামলা বিচারাধীন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বিরোধপূর্ণ প্রায় ৪০ শতক জমি আগে নুরুল ইসলাম ভোগদখল করতেন। ২০১৬ সালে বন বিভাগ জমিটি অধিগ্রহণ করে। পরে জমিটির দেখভালের দায়িত্ব পান মংফু চাকমা। স্থানীয়দের দাবি, তিনি পরে জমিটি সাবেক ইউপি সদস্য মো. বেলালের কাছে বিক্রি করেন। সম্প্রতি সেখানে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়াকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিরোধের সৃষ্টি হয়।
ওই দিন সন্ধ্যায় মূল ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ গজ দূরে মংফু চাকমাসহ আশপাশের ১০ থেকে ১২টি পরিবারের ব্যবহৃত একটি বৌদ্ধ মন্দিরে কয়েকটি বুদ্ধমূর্তি ভাঙচুরের অভিযোগ তুলে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করা হয়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটিকে বৌদ্ধ মন্দিরে হামলা এবং সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হিসেবে প্রচার করা হয়।
এদিকে স্থানীয় তঞ্চঙ্গা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি মং চৌধুরীর অভিযোগ, ২০০৭ সাল থেকে চলমান জমি–বিরোধের জের ধরে স্থানীয় নুরুল হকের নেতৃত্বে আনুমানিক ২০০ জনের একটি সশস্ত্র দল হামলা চালায়। তাঁর দাবি, হামলার সময় বৌদ্ধ মন্দিরে ভাঙচুর করা হয় এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের ভয়ভীতি দেখানো হয়।
খবর পেয়ে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুল রহমানের নেতৃত্বে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। পুলিশ মন্দিরে কয়েকটি বুদ্ধমূর্তি কাত হয়ে থাকতে দেখলেও স্থানীয় পর্যায়ের অনুসন্ধানে সংঘবদ্ধ হামলা, সংখ্যালঘু পরিবারের বাড়িঘর ভাঙচুর কিংবা গুরুতর হতাহতের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে মং চৌধুরীর অভিযোগের সত্যতা এখনো নিশ্চিত করা হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে নুরুল হকের বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
ঘটনার পর চাকমা সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ১ আগস্ট একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। এরপর থেকে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারাও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, “প্রাথমিকভাবে এটি জমিসংক্রান্ত বিরোধ বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্ত শেষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার বলেন, “সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে উপজেলা প্রশাসনের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। প্রয়োজনে আমি নিজেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করব।”
উপজেলা প্রশাসনের দাবি, এখন পর্যন্ত বৌদ্ধ মন্দিরে সংঘবদ্ধ হামলা বা সাম্প্রদায়িক সহিংসতার অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ মেলেনি। বন বিভাগের ভাষ্যও একই। তাদের দাবি, সংরক্ষিত বনভূমির জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ থেকেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন গুজব বা যাচাইবিহীন তথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। বর্তমানে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে

পাঠকের মতামত